একসময় জমিজমা, পরিবার আর স্বপ্নে ভরা ছিল জীবন। কিন্তু আজ ১০৪ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিনের দিন কাটে নিঃসঙ্গতা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার রাজারামক্ষেত্রী গ্রামে আবাদি জমির মাঝখানে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।
ঘরটিতে নেই বিদ্যুতের সংযোগ, নেই শৌচাগারের ব্যবস্থা, এমনকি যাতায়াতের জন্যও নেই কোনো উপযুক্ত রাস্তা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও শারীরিকভাবে অক্ষম হাফিজ উদ্দিনের জীবন এখন অনেকটাই নির্ভরশীল প্রতিবেশীদের দয়ার ওপর। কেউ খাবার দিলে পেট ভরে, আর না দিলে উপোস করেই কাটে দিন।
১৯২২ সালের ১১ জুলাই জন্ম নেওয়া হাফিজ উদ্দিন একসময় ছিলেন স্বচ্ছল কৃষক। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার। তবে ছেলে সন্তান না থাকার সুযোগে আত্মীয়স্বজন কৌশলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। সংসার চালাতে বাধ্য হন ভিক্ষাবৃত্তিতে, তবুও কষ্ট করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।
প্রায় ১৪ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করেন হাফিজ উদ্দিন। এরপর থেকে স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। সেই সময় থেকেই সংসারে ভাঙন শুরু হয়। একপর্যায়ে স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। তারপর থেকেই একাকীত্ব তার নিত্যসঙ্গী।
বর্তমানে সরকারি বয়স্ক ভাতা ও ভিজিএফের চাল পেলেও তা নিয়মিত নয় বলে জানান তিনি। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শতবর্ষী এই বৃদ্ধের জীবনযাপন অত্যন্ত মানবেতর। বৃষ্টির দিনে টিনের ছাউনি দিয়ে পানি পড়ে, ঝড়ের সময় আতঙ্কে কাটাতে হয় রাত। বয়সের কারণে কোনো কাজ করতে না পারায় প্রতিবেশীদের সহায়তাই তার প্রধান ভরসা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, “চাচা খুব কষ্টে আছেন। কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে না খেয়েই থাকেন। আমরা যতটুকু পারি সাহায্য করি, কিন্তু তার জন্য আরও বড় ধরনের সহায়তা দরকার। তার ঘরে কোনো টয়লেট নেই, বিদ্যুৎও নেই। অন্ধকারে থাকেন। চারপাশে পোকামাকড়, কখন যে কী হয় আল্লাহই জানেন।”
হাফিজ উদ্দিন বলেন, “বয়স হইছে অনেক। চলাফেরা করতে পারি না। কেউ খাবার দিলে খাই, না দিলে উপোস থাকি। আল্লাহ যতদিন রাখে, ততদিন এভাবেই চলতেছি। কেউ যদি একটা হুইলচেয়ার দিত, তাহলে আমার অনেক উপকার হইত।”
এ বিষয়ে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফ বলেন, “আপনার মাধ্যমে বিষয়টি অবগত হলাম। পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীদের কেউ উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতাসহ একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, মানবিক বিবেচনায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের দ্রুত এগিয়ে এসে শতবর্ষী হাফিজ উদ্দিনের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা উচিত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অন্তত সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পাওয়ার অধিকার তারও রয়েছে।