বৃহস্পতিবার,৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কালিগঞ্জ এলজিইডিতে ‘ঘুষ উৎসব’: সিসিটিভি গায়েব করেও শেষ রক্ষা হলো না হিসাব রক্ষক মোস্তাফিজের

অফিসের ডেস্কে বসে প্রকাশ্য দিবালোকে গুনে গুনে ঘুষ গ্রহণ। প্রমাণ মুছতে সরকারি অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরা গায়েব। এমনকি নারী কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অভিযোগ। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আলোচিত সেই ‘মহা ঘুষখোর’ হিসাবরক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানকে অবশেষে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করে ১০ কার্য দিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৮ এপ্রিল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমানের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, দাপ্তরিক টেবিলে বসে তিনি দুই ব্যক্তির কাছ থেকে প্রকাশ্যে অর্থ নিচ্ছেন। এই ভিডিওটি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালে প্রচার হওয়ার পর এলজিইডির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। এর প্রেক্ষিতে গত ২৭/৪/২৬ ইং তারিখের এক আদেশে (স্মারক নং- ৩৯৯০) তাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র দায়ে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঘুষ কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে মোস্তাফিজুর রহমান গত ২২ এপ্রিল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অফিস থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে ফেলেন। যাতে ভবিষ্যতে ঘুষ গ্রহণের কোনো ডিজিটাল প্রমাণ না থাকে।শুধু তাই নয়, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবদের দ্বারে দ্বারে ধর্ণা দেন তিনি। চাম্পাফুল ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক গাইন জানান, উপজেলা প্রকৌশলীর নাম ভাঙিয়ে কৌশলে তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে কুশুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মাহমুদ আব্দুল্লাহর মতো অনেকেই তার অনৈতিক আবদারে সাড়া না দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন। মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে কেবল অর্থ আত্মসাৎ নয়, উঠেছে গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগ।জানা গেছে, সরকারি বাসায় না থেকে তিনি উপজেলা ডরমেটরিতে থাকতেন। সেখানে অফিসের এক এলজিএস নারী কর্মীকে দিয়ে কাজ করানোর অজুহাতে প্রায়ই ভোরে নিজের কক্ষে ডেকে নিতেন। ডরমেটরির রান্না ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এই ‘অসামাজিক কার্যকলাপের’ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জানাজানি হওয়ার পর উপজেলা প্রকৌশলী ওই নারী কর্মীকে অফিস থেকে বের করে দিলেও মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অফিসে বসে হিসাবরক্ষকের এই লাগামহীন ঘুষ বাণিজ্যের পেছনে উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেনের পরোক্ষ মদদ রয়েছে এমনকি তিনিও জড়িত বলে গুঞ্জন উঠেছে। সিসিটিভি ক্যামেরা অপসারণের বিষয়ে প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান যে তিনি বিষয়টি শুনেছেন, কিন্তু বাস্তবে অফিসে গিয়ে ক্যামেরার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সচেতন মহলের প্রশ্ন-একজন হিসাবরক্ষক দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ঘুষ নিলেও এবং সিসিটিভি সরিয়ে ফেললেও কেন প্রকৌশলী নিশ্চুপ ছিলেন এর আগে গত ২৩ এপ্রিল মেহেরপুর থেকে শহিদুল ইসলাম নামে এক হিসাবরক্ষককে কালিগঞ্জে বদলি করা হলেও প্রভাবশালী মহলের তদ্বিরে মোস্তাফিজ নিজের আসন ধরে রাখেন। পরে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হলে তিনি সাতক্ষীরা সদর বা কলারোয়ায় বদলির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা পেলেও, কেন তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হবে না-তা নিয়ে দশ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। কালিগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও ঠিকাদারদের দাবি, কেবল বরখাস্ত নয়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের সঠিক তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

test123123

test123123

test123123

test123123