ফরিদা পারভিন বলছিলেন, ‘এবার নদীতে পানি বাড়লে সরাসরি আইলে ধাক্কা দিবে। ভাঙন শুরু হলে- প্রথমেই আইল(বেরিবাঁধ) ভাঙবে। ইচ্ছামত মাটি কাটায় নদীর চেয়ে আইলের গোড়া গভীর হয়ে গেছে। আইলের গাছপালাও শেষ। এবার যদি চব্বিশের মত নদীতে পানি বাড়ে তাহলে কি দিয়ে এই আইল টিকাবে বুঝি না। জন্মের পর থেকে এই নদী দেখে বড় হই- এবারের মত এভাবে নদীর বুক খুড়ে মাটি নিতে দেখি নাই।’
সোমবার বিকেলে কুমিল্লার গোমতী নদীর চরে গিয়ে কথা হয় সদর উপজেলার পাঁচথুবি ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ সেলিনা, পারভীন ও ফরিদা বেগমের সাথে। তারা সবাই একসাথে গরু- ছাগল চড়াতে এসেছেন গোমতীর চরে। গোমতী নদীর ক্ষতবিক্ষত চর দেখে চরম হতাশ তারা।
ফরিদা বেগম বলেন, চরে এই সময় সবুজ শাক সবজি থাকার কথা। মাটি কাটার কারনে জমি শেষ। কোন কোন জায়গায় ২০ ফুট গভীর করেও কাটা হয়েছে। মাটির সাথে গাছও কেটে ফেলা হচ্ছে।
ওখানেই কথা হয় এলাকার বাসিন্দা সোহাগ ও সুজনের সাথে। তারা বলেন, ‘আগে নদীর পানি বাড়লে আগে জমি ভাঙতো এবার সোজা রাস্তা ভাঙবে। যারা মাটি কাটে তারা শক্তিশালী, বাঁধা দিলেই হুমকি ধমকি দেয়। দক্ষিণ পাড় থেকে এসে উত্তর পাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যায়।’
তারা জানান, একটা জমির মাটি কাটা হলে আশেপাশের জমিও ভাঙতে শুরু করে। তখন বাধ্য হয়েই অন্যরা জমির গাছপালা ও ফসল তুলে নিয়ে যেতে হয়।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রাতের আঁধারে গোমতী নদীর চরে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে একদল দুর্বৃত্ত। একই সাথে পাড়ের গাছপালাও উজাড় করছে মাটি ব্যবসায়িরা। ব্যাপকভাবে মাটি কেটে নেওয়ায় কংকালসার হয়ে পড়েছে গোমতীর চর। এতে ফসলি জমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাটি বহনকারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের চাকার ঘর্ষণে ক্ষয় হচ্ছে শহর রক্ষা বাঁধও। টিক্কার ব্রিজ, শাওয়ালপুর, গোলাবাড়ি, সামারচর, রত্নাবতী বানাশুয়া, পালাপাড়াসহ শতাধিক স্থানে চরের মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। পাউবো, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের নাকের ডগায় গোমতী কেটে বিপদ ডেকে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। প্রতি ট্রাক মাটি সর্বনিম্ন ৯০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব মাটি যাচ্ছে জলাশয় ভরাট ও ইটভাটায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দলীয় ও প্রশাসনিক পরিচয় ব্যবহার করে চরের মাটি কাটা হচ্ছে।
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরর উপপরিচালক মিজানুর রহমান জানান, গোমতীর চরে প্রায় ৫৯ হাজার কৃষক সবজি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। এখানকার সবজি কুমিল্লার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। তবে চরের মাটি কাটায় সবজি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে গেলো শুক্রবার কুমিল্লা সার্কিট হাউজে কৃষি, খাদ্য মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের মন্ত্রী হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন। সে সময় গণমাধ্যমকর্মীরা গোমতীর চরে অবাধে মাটি কাটার বিষয়ে অভিযোগ তুলে ধরলে মন্ত্রী জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে চরের মাটি কাটা বন্ধে কঠোর নির্দেশ দেন।
স্থানীয়রা জানান, মন্ত্রীর এমন নির্দেশের পর অনেক জায়গায় মাটি কাটা থামলেও কিছু কিছু এলাকায় রাত হলে আলো বন্ধ করে দিয়ে মাটি কাটছে দুর্বৃত্তরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান জানান, রোববার রাত থেকে দুজন ম্যাজিষ্ট্রেট গোমতী নদীর চরে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাটি কাটা দূর্বৃত্তদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে কঠোর অভিযান চলছে। মাটি কাটা দুর্বৃত্তদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।




