বাগেরহাট-৩ (মোংলা-রামপাল) আওয়ামী লীগের দুর্গ দখলের লড়াইয়ে জামায়াত-বিএনপি

আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাগেরহাট-৩ (মোংলা-রামপাল) আসনে ভোটের সমীকরণ এবার পুরোপুরি বদলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচনী মাঠে সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আওয়ামী প্রার্থী শূন্য থাকায়, এটিকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী চেষ্টা করছে একটি শক্ত অবস্থান তৈরির। অন্যদিকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে বিএনপি প্রার্থী নিজের অবস্থান যাতে দুর্বল না হয়ে পড়ে তার চেষ্টা করছেন। ফলে আওয়ামী লীগবিহীন এই আসনে ভোটের লড়াইয়ে চমক দেখা যেতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগের বিপুল ভোটব্যাংককে ঘিরেই এখন মূল লড়াই। ক্ষমতাচ্যুত দলটির বিশাল ভোটব্যাংক দৃশ্যত অনিশ্চিত ও নীরব। আর এই নীরবতাই হয়ে উঠেছে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলা এবং পাশেই রামপাল উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও মোংলা পোর্ট পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৩ সংসদীয় আসনটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কখনও এককভাবে, কখনও জোটবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। তবে প্রতিবারই বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর থেকেই এই আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত।
এবারের নির্বাচন সেই ইতিহাসে বড় ধরনের ছেদ পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকলেও দলটির সুসংগঠিত ও বৃহৎ ভোটব্যাংকই এবার ফল নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে। সেই ভোট কোন দিকে যাবে তা নিয়ে এলাকায় চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা ও হিসাব-নিকাশ।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় না থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। অনেকেই নিরাপত্তার কারণে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন এবং ভোটের দিন কেন্দ্রে যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও একাধিক নেতাকর্মী এমন তথ্যই জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনরা ভোট দেবেন কি না এ ব্যাপারে বেশিরভাগ পরিবারই কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘নীরব ভোটব্যাংক’ই শেষ পর্যন্ত ফল ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এই আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অতীতে এই ভোটের বড় অংশ আওয়ামী লীগের পক্ষে গেলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের কেউ কেউ এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয় তাদেরই হবে। বিএনপির এক জোট নেতা বলেন, আমাদের প্রার্থী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ২০ বছর ধরে মোংলা-রামপাল মানুষের পাশে থেকে কাজ করেছেন। তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। মানুষ এবার প্রতীক নয়, যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেবে।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। ভোটের স্বার্থে নয়, মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানুষ যদি সেই মানবিক অবস্থান মনে রাখে, তার প্রতিফলন ভোটে দেখা যেতে পারে।
অপরদিকে জামায়াতের প্রার্থী এ্যাডঃ মাওঃ শেখ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, আওয়ামী লীগ পতনের পর এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও রাহাজানি ঠেকাতে আমাদের দলীয় নেতাকর্মীরা কাজ করেছেন। এ ছাড়া বিগত দিনে থেকেও জামায়াতে ইসলামী এখানে নানান কাজ করে যাচ্ছে। তিনি এসব কারণে ভোটারদের রায় তার পক্ষে যাবে বলে আশাবাদী।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সততা ও কাজের রেকর্ডকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাগেরহাট-৩ আসনে এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ, স্থানীয় প্রভাব এবং নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক যদি খণ্ডিত হয়, তবে ফলাফলে অভূতপূর্ব কিছু হতে পারে। আর যদি কোনো একটি পক্ষ সেই ভোটের বড় অংশ নিজেদের দিকে টানতে পারে, তাহলে আলোড়ন তোলার মতো চমক সৃষ্টি হবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন