উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত বগুড়া শহর দিন দিন বহুতল ভবন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তারে আধুনিক হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও, শিশু, কিশোর ও তরুণদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের অন্যতম প্রধান উপাদান—বিনোদনের সুযোগ—ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বগুড়া শহরের বর্তমান বিনোদন পরিস্থিতি विश्लेषण করলে দেখা যায়, ‘মম ইন’ (Momo Inn) ছাড়া আধুনিক বা প্রিমিয়াম মানের বিনোদন কেন্দ্র প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের অভাব তরুণ সমাজকে এক ধরনের ‘বিনোদন খরার’ মধ্যে ফেলেছে।
বগুড়ার বর্তমান বিনোদন ব্যবস্থা, উন্মুক্ত খেলার মাঠের সংকট এবং হাই-এন্ড আধুনিক বিনোদন কেন্দ্রের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে
হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ
একসময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় খোলা মাঠে খেলাধুলার যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন প্রায় বিলুপ্ত। আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ বর্তমানে নানা বাণিজ্যিক আয়োজন, মেলা কিংবা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত নেই।
ফলে শিশু ও কিশোরদের বড় একটি অংশ বিকেলের খেলাধুলা থেকে সরে গিয়ে মোবাইল, কম্পিউটার ও অন্যান্য স্ক্রিননির্ভর বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সীমিত বিকল্প, কমছে আগ্রহ
‘মম ইন’-এর বাইরে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিনোদনের বিকল্প খুবই সীমিত।
স্টেডিয়াম রোডের ওয়ান্ডারল্যান্ড শিশু পার্ক দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও এর অধিকাংশ রাইড ও পরিবেশ আধুনিক সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ছোট শিশুদের জন্য কিছুটা উপযোগী হলেও কিশোর ও তরুণদের আকৃষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত উপাদান সেখানে নেই।
অন্যদিকে, পৌর পার্ক বা এডওয়ার্ড পার্কের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে জনমনে অসন্তোষ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব পার্ক আধুনিক বিনোদন চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে না।
এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট আকারের পিসি বা প্লেস্টেশন গেমিং জোনগুলোও সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেখানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের সুযোগ নেই।
হাই-এন্ড গেমিং ও ভিআর সুবিধার অভাব
বর্তমান প্রজন্মের বিনোদনের ধারণা শুধু রেস্টুরেন্ট বা সাধারণ পার্ককেন্দ্রিক নয়। রাজধানীর বিভিন্ন আধুনিক বিনোদন কেন্দ্রে বর্তমানে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR), রেসিং সিমুলেটর, বোলিং, মোশন গেমসসহ প্রযুক্তিনির্ভর নানা সুবিধা রয়েছে।
তবে বগুড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিক্ষানগরীতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানের ইনডোর গেমিং ও ফ্যামিলি এন্টারটেইনমেন্ট জোনের অভাব স্পষ্ট। সংশ্লিষ্টদের মতে, শহরের তরুণদের মধ্যে এ ধরনের বিনোদনের চাহিদা এবং আর্থিক সক্ষমতা—দুই-ই বিদ্যমান।
বিনিয়োগের সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, বগুড়ার এই বিনোদন সংকট শুধু সামাজিক সমস্যাই নয়, বরং এটি একটি বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। ‘মম ইন’-এর জনপ্রিয়তা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, মানসম্মত বিনোদনের জন্য বগুড়ার মানুষ ব্যয় করতে প্রস্তুত।
নগর পরিকল্পনাবিদ, পৌর কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মতে, দ্রুত উন্মুক্ত খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
একটি শহর তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়ে ওঠে, যখন সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত খোলা মাঠ, সবুজ পরিবেশ এবং যুগোপযোগী সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
এখন প্রশ্ন—বগুড়া কি সেই পথে এগোবে?




