হাওরে হাহাকার: সিলেট-সুনামগঞ্জে পানির নিচে বোরো ধান, কৃষকের চোখে কান্না

সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে অতি বৃষ্টি ও আকস্মিক জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ বোরো ধানের ক্ষেত। মাঠজুড়ে এখন শুধু পানি আর পানির বুক চিরে ভাসছে কাটা ধানের স্তূপ। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে চরম সংকট ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক পরিবার। দিরাই উপজেলার বরাম, চাপতি ও টাংনির হাওরসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চলে পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে। কোথাও ধান কাটার আগেই শেষ, কোথাও আবার কষ্ট করে কাটা ধান খলায় শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। অনেক স্থানে পানির তোড়ে ধানের গাদা ভেসে যেতে দেখা গেছে। হাওরের বুকজুড়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য—পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কৃষকের কান্না, কাঁধে ভর দিয়ে এক বৃদ্ধ কৃষক শেষ চেষ্টা করছেন ডুবে যাওয়া ধান টেনে তুলতে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে পানিতে নুয়ে পড়া সোনালি শীষ। যেন কৃষকের বছরের স্বপ্ন আজ কাদামাটির সঙ্গে মিশে গেছে। শ্রমিক সংকট, জমিতে অতিরিক্ত কাদা এবং টানা বৃষ্টির কারণে সময়মতো ধান কাটতে পারেননি কৃষকেরা। অনেক এলাকায় হারভেস্টার মেশিন পৌঁছাতে না পারায় জমিতে পেকে থাকা ধান শেষ পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বরাম হাওরপাড়ের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “ধার করে চাষ করি। ধান ভালো হলে ঋণ শোধ করি। এবার সব শেষ। কীভাবে ঋণ শোধ করব, বুঝতে পারছি না।” চাপতি এলাকার কৃষাণী ফুলতেরা বেগম বলেন, “এই ধানই আমাদের সব। এখন ধান নেই, হাতে টাকা নেই। সংসার কীভাবে চলবে জানি না।” স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু অতিবৃষ্টি নয়—অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণেও জলাবদ্ধতা দীর্ঘ হয়েছে। এতে ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়েছে। টাংনির হাওরের কৃষক শাহ আলম বলেন, “পানি নামার পথ নেই। জমিতে পানি আটকে আছে। কাটা ধানও নষ্ট হচ্ছে। ঋণ নিয়ে চাষ করেছি, এখন সবচেয়ে বিপদে আছি।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোরঞ্জন অধিকারী জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে হাওরের ফসল ঝুঁকিতে পড়ে। নদী, খাল ও বিল খনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আজ হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে শুধু পানি, ভাসমান ধান আর কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। সেই পানির দিকে তাকিয়ে নীরবে কাঁদছেন এক ফসলনির্ভর মানুষগুলো।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন