হুমকির মুখে সাভারের কৃষি জমি-জলাশয় : দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শতাধিক ভূমিদস‍্যু

সংসদ নির্বাচন আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে একশ্রেনির অসাধু ব্যক্তি সময়ের সদ্ব্যবহার করে সাভারের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল, জলাশয়, নদী-নালা এমনকি সরকারী বনভূমি, জমি ভরাট করে অবৈধভাবে গড়ে তুলছে প্লট, ইমারত। সরকার পরিবর্তনের পরও এখনও থামছে না তাদের দৌরাত্ব। ইতিমধ্যে এ অঞ্চলে বিলীনের পথে প্রায় শত শত একর জলাধার ও ফসলি জমি। জোরপূর্বক অনেক অসহায় মানুষের ভূমি দখল করে গড়ে তুলছে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প।
অভিযোগ আছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় স্থানীয় ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই এ কর্মকান্ড করছে তারা। শতাধিক ভূমি খেকোরা আজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো সাভার। তবে এ সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন দখলকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ভুক্তভোগি ও সাধারন মানুষের দাবি অবিলম্বে নতুন সরকারের হস্তক্ষেপে এ সকল ভূমি খেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করার।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের বিলামালিয়া মৌজার আর এস ৩৩৩৭ নং দাগের বিস্তৃর্ন জলাশয়ের জমি বালু ভরাট করছে দখলদার রিমন মিয়া ও ইমদাদুল হক নামে দুইজন । পাশাপাশি এতে পার্শ্ববর্তী সরকারী খালও ভরাট করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় তাদের শেল্টার দিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রেলিক সিটি কেলেঙ্কারীর হোতা, ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত নূরুজ্জামান।
এ ব্যাপারে নূরুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে সরকারী জমি দখলের বিষয়ে অস্বীকার করেন তিনি। আর জলাশয় ভরাটে নিষিদ্ধের কথা বললে এড়িয়ে যান। পরে বলেন এ বিষয়ে ভূমি অফিস জানে।
বিরুলিয়া ইউনিয়নের আকরাইন মৌজায় মরহুম ইয়াজউদ্দিনের ছেলে ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ওয়ারিশ সুত্রে পাওয়া তার জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে আছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। তিনি আরো অভিযোগ করেন তার পৈত্রিক সম্পত্তিতেও সে কোন কাজ করতে পারছে না, বাধা দিচ্ছে। সে জানায় এ অঞ্চলের অনেকের জমিই জোরপূর্বক গ্রাস করে নিয়েছে। অসহায় অনেক মানুষ পরে বাধ্য হয়ে অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এ ব্যাপারে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ (ল্যান্ড) এর ডিজিএম অনুপ কুমার ঘোষ বলেন, এরকম অনেকেই অভিযোগ করে থাকে। তাদের যদি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে তা সামনাসামনি বসে দেখতে হবে।
 জমি পাইলে আমরা কিনে নেব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে দখলের ব্যাপারটি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে বলেও জানান তিনি।
এমনিভাবে পাথালিয়ার সিন্দুরিয়ায় বংশী নদী দখল করে ভূমিদস্যু জহির, সালেহপুরে রেজাউল হক জামাল, কমলাপুরে বিলাস চক্র, সাধাপুরের শওকত, মাসুম , নাসির, মোগড়াকান্দার মামুন ও রাজীব, রাজফুলবাড়িয়া এলাকার শফিকুল ইসলাম সাবু, আনোয়ার হোসেন, গেন্ডা এলাকার রাজা বাহিনীর প্রধান আবুল হাশেম ওরফে রাজা ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড জালাল মিয়া। এছাড়াও শিমুলিয়ার নলাম, বিরুলিয়ার ও আশুলিয়ার তুরাগপাড়, ভাকুর্তা, আমিনবাজার, কাউন্দিয়া, ধামসোনা, পাথালিয়াসহ পুরো সাভার জুড়ে শতাধিক প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা এখন সক্রিয়।
এ সকল ভূমিদস্যুদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় মানুষকে জীবন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। আহত হচ্ছে বহু। এমনকি গত বছরের ১৭মে বন বিভাগের জমি দখলে বাধা দিতে গিয়ে বন কর্মকর্তা মহিদুর ইসলামসহ আহত হয় পাঁচজন। এর আগেও এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এ সকল ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে, কতক গ্রেফতার হয়েছে তবে আশানুরুপ ফল পাওয়া যায়নি। প্রতিবাদে কৃষক, শ্রমিক, মজুর ও সাধারন মানুষসহ হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ, স্মারকলিপি ও মানববন্ধন করেছে। এরপরও এ চক্রের দৌরাত্ন কমেনি। অভিযোগ করে ভূমি অফিসের দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশে তারা দাপিয়ে বেড়ায় সর্বত্র। আর এতেই এ অঞ্চলের শত শত একর কৃষি জমি ও জলাশয় এখন বিলীনের পথে।
এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা ভূমি অফিসের কানুনগো জিয়া উদ্দিন জানান, আমাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কথা অমূলক, ভিত্তিহীন। তবে নির্দিষ্ট জমি দখলের বিষয় উল্লেখ করলে দায় এড়িয়ে তিনি জানান, এগুলোর বিষয় উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বলতে পারেন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আব্দুল্লাহ আল-আমীন বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ এলেই আমরা তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেই। জলাশয় ভরাট কিংবা সরকারি জমি দখলের বিষয়টি গোচরে এলে ব‍্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা-১৯(সাভার) এর নবনির্বাচিত সাংসদ ডাঃ দেওয়ান মোঃ সালাউদ্দিন বাবু বলেন, এটা আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটা। কোন ভূমিদস্যুকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্নক আইন প্রয়োগ করা হবে। সাভারকে দখলবাজ ও ভূমিদস্যুমুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন