কালিগঞ্জে ভোটের অঙ্কে বিএনপির সংকট

সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল শুধু একটি হার নয়-এটি একটি কঠোর সতর্কবার্তা। কালিগঞ্জের ভোটের অঙ্ক নির্মমভাবে বলে দিচ্ছে, প্রতিপক্ষের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল নিজেদের ভেতরের বিভাজন। দলীয় প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীনের প্রাপ্ত ৩৩,৬৮৭ ভোটের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী ডা. শহিদুল আলমের ৬৫,৩৭২ ভোট প্রমাণ করে-তৃণমূলের আস্থা ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে ফাঁক কতটা গভীর। ঐক্যের পরিবর্তে বহিষ্কার, সমন্বয়ের বদলে সংঘাত-এই বাস্তবতা কালিগঞ্জে বিএনপিকে শুধু পরাজিতই করেনি, বরং সাংগঠনিক অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

তবে স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা যায়, প্রার্থী ঘোষণার আগেই ওয়ার্ড কমিটি গঠন ও সদস্য ফরম বিতরণ নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের কর্মীদের বেশি ফরম দেওয়া, তড়িঘড়ি সদস্য সংগ্রহ এবং অনিয়মের কারণে ধলবাড়িয়া ইউনিয়নে প্রকাশ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। একই চিত্র উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নেও দেখা যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে উপজেলা বিএনপি কার্যত দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একাংশ কাজী আলাউদ্দীনের পক্ষে এবং আরেকাংশ ডা. শহিদুল আলমের পক্ষে আলাদা কমিটি গঠন করে। কেন্দ্র যখন কাজী আলাউদ্দীনকে ধানের শীষ প্রতীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়, তখন এই বিভাজন চরম রূপ নেয়।

যার ফলে দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা ডা. শহিদুল আলমকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তাঁর সমর্থকরা টানা ১৭ দিন আন্দোলন ও বিক্ষোভ করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তা আমলে নেয়নি। ফলে যে দল ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার কথা ছিল, তারা নিজেরাই মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কালিগঞ্জে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায় থেকে ৫০ জনেরও বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এই বহিষ্কারাদেশ কতটা স্বচ্ছ বা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারিগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব কাজী আবু সাঈদ সোহেল বলেন, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় থেকেও তারা বহিষ্কারাদেশ পেয়েছেন, অথচ বহিস্কার সম্পর্কে প্রার্থী নিজেও অবগত ছিলেন না। সাংগঠনিক শৃঙ্খলার নামে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত দলের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কালিগঞ্জ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ মেহেদী নির্বাচনের আগে দক্ষিণশ্রীপুর, মৌতলা, বিষ্ণুপুর, ধলবাড়িয়া, রতনপুর, মথুরেশপুর সহ একাধিক ইউনিয়নে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান। এছাড়া অনেক আওয়ামীলীগ নেতা প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়ায় মানুষ বিরক্ত হয়ে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে।

র্তমানে কালিগঞ্জ বিএনপির সামনে তিনটি প্রধান প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে ১। বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনা করে তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব কি না? ২। ভবিষ্যতে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় হাই কমান্ড সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেবে কি না? ৩। বিভাজিত এই সংগঠনকে পুনর্গঠন করে আগামী দিনের লড়াইয়ে টিকে থাকা যাবে কি না?

এই প্রশ্নে শেখ আলাউদ্দীন সোহেল কালিগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সাবেক আহবায়ক তিনি বলেন, ২০০৯ সালে পুলিশ নাজিমগঞ্জ থেকে আমাকে তুলে আনে। নির্মম নির্যাতনের পর মামলা দিয়ে আমাকে জেলে পাঠায়। এর পর কালিগঞ্জে কোন মামলা হলে আমাকে বাদ দেয়নি। আমরা নির্যাতনের স্বিকার হয়েও দল ছাড়িনি। আমি ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ভোট চেয়েছি, সভা সমাবেশ করেছি তার পরেও দল আমাদের অনেককে বহিস্কার করছে।

কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা খায়রুল আলম যিনি মাঠে থেকে মামলা হামলা মোকাবেলা করেছেন তিনি বলেন, দলীয় কোন্দল নয়, এখন সবাইকে একসাথে চলতে হবে। যারা বহিস্কার হয়েছে তারা খোদ বিএনপির নেতা কর্মী। প্রত্যেকের নামে ৫০-৬০ টি মামলা আছে। তারা পালিয়ে থেকেছে। আওয়ামীলীগের নির্যাতনে তারা দিশেহারা।

কালিগঞ্জ উপজেলা কৃষক দলের সাবেক আহবায়ক রোকনুজ্জামান বলেন, বহিস্কার দলীয় সিদ্ধান্তে হয়েছে। তবে এই মুহুর্তে দলের একটি সুসংহত কমিটি দেখতে চাই। তানাহলে আগামীতে আন্দোলন সংগ্রামে দলের দৈন্যতা ফুটে উটবে।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গির আলম বলেন -“আমরা দলীয় বিভাজন চাই না” এটি প্রতিটি ত্যাগী নেতা কর্মীর মনের কথা। আমরা আগামীতে সবাই মিলে কাজ করতে পারলে দল সুসংগঠিত হবে।

কালিগঞ্জে বিএনপি এখন এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি। ভোটের অঙ্ক ইঙ্গিত দিচ্ছে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে এই আসনেই জয় সম্ভব ছিল। কিন্তু কেন্দ্রের শৃঙ্খলা নীতি আর তৃণমূলের জনপ্রিয়তার দাবির মধ্যকার এই ভাঙন যদি দ্রুত জোড়া না লাগে, তবে তা দলটির জন্য কেবল সাংগঠনিক সংকট নয়, বরং অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সমীক্ষাতেই আটকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রে সেতু নির্মাণ, ভরসা এখনো বাঁশের সাঁকো

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রাম এবং গাজীপুরের কাপাসিয়া