মঙ্গলবার,২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

যন্ত্র আছে শিক্ষা নেই চারঘাটে ডিজিটাল ল্যাবের বেহাল চিত্র

সরকারি অর্থায়নে শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাবের অধিকাংশই বর্তমানে অচল হয়ে পড়েছে। কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ল্যাবগুলোর বেশিরভাগ ল্যাপটপ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বিকল, নেই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা প্রশিক্ষিত ল্যাব সহকারী। ফলে সরকারের ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ অনেক প্রতিষ্ঠানে কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে।

সম্প্রতি উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চারটি কলেজ সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব ব্যবহার হচ্ছে না। কোথাও নষ্ট যন্ত্রপাতি আলমারিতে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে, আবার কোথাও শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে ল্যাবকেই সাধারণ শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তবভিত্তিক কম্পিউটার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

উপজেলার নন্দনগাছী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২১ সালে স্থাপিত ডিজিটাল ল্যাবের ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে ১৩টিই বর্তমানে অচল। ভেঙে গেছে ল্যাবের চেয়ার-টেবিলও। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ল্যাবটি। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম জানায়, তারা আইসিটি বিষয়টি শুধু বই থেকেই পড়ে, কম্পিউটারে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ খুব কমই পায়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান আখন্দ বলেন, “একটি ল্যাপটপের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করায় অল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ বিকল হয়ে যায়। একাধিকবার মেরামতের জন্য তালিকা পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

একই চিত্র দেখা গেছে রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়েও। প্রতিষ্ঠানটির জন্য বরাদ্দ দেওয়া ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে ১৫টিই নষ্ট। দুটি প্রজেক্টর ও একটি প্রিন্টারও অকেজো হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজদার আলী বলেন, “ল্যাব সহকারী না থাকায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল বইয়ের মধ্যেই কম্পিউটার শিক্ষা সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।”

একাধিক শিক্ষক জানান, সফটওয়্যার হালনাগাদ, ভাইরাস প্রতিরোধ এবং হার্ডওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় ধীরে ধীরে অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই অচল হয়ে পড়ছে।

রাওথা কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ডিজিটাল ল্যাবটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ল্যাবের ল্যাপটপ, স্ক্যানার ও প্রিন্টারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আলমারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

কলেজের অধ্যক্ষ নাদের আলী বলেন, “শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাই আপাতত ল্যাবটি শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে।”

এদিকে বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয় ও সরদহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছে, সচল সরকারি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে না রেখে শিক্ষকদের বাড়িতে রাখা হয়েছে। সরেজমিনে ল্যাব পরিদর্শনের সময় কয়েকটি ল্যাপটপ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তবে বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ল্যাপটপগুলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়নি। মেরামতের উদ্দেশ্যে বাইরে পাঠানো হয়েছে।”

উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার রাহেদুল ইসলাম বলেন, “ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছিল যে ভবিষ্যতে যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে নিজেদের অর্থায়নে মেরামত করবে। সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা যাচাই করা হবে।”

উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ল্যাব সহকারী নিয়োগের সুযোগ তৈরির জন্য ল্যাব গ্রহণ করেছে। পরে যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। কোথাও নিয়োগ বাণিজ্য, কোথাও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে।”

উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা মাহফুজ আরিফিন জানান, উপজেলার ১৮টি ডিজিটাল ল্যাব পরিদর্শন করে নষ্ট যন্ত্রপাতির তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের বাস্তব চিত্র তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দ্রুত ল্যাবগুলো সচল করে শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

সোমবার ২৭ জুলাই, ২০২৬ সুনামগঞ্জ পিটিআই মিলনায়তনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে