গণআন্দোলন, মহাসড়ক অবরোধ এবং কুশপুত্তলিকা দাহের মুখে গৌরনদী থেকে শাস্তিমূলক বদলি হওয়া বিতর্কিত চিকিৎসক ডা. মো. মনিরুজ্জামানকে বরিশালের নতুন সিভিল সার্জন করা হয়েছে। গত ২১ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে জেলার এই শীর্ষ পদে পদায়ন করা হয়। একজন চিহ্নিত ‘কমিশন বাণিজ্যের’ হোতা এবং জুলাই আন্দোলনের চেতনাবিরোধী কর্মকর্তাকে পুরো জেলার স্বাস্থ্য অভিভাবক করায় সিভিল সমাজ ও চিকিৎসকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে অনিয়মের স্বর্গরাজ্য:
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় ডা.মনিরুজ্জামান গৌরনদীতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। হাসপাতালের সরকারি ওষুধ কালোবাজারে পাচারের পরোক্ষ প্রশ্রয়, ভুয়া ভাউচারে সরকারি ফান্ড আত্মসাৎ এবং বছরের পর বছর একই এলাকায় পদ আঁকড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁর কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না।
আহত ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসাবঞ্চিত করার অমানবিকতা:
ডা.মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়কালের। গৌরনদীতে ছররা গুলি ও আওয়ামী লীগের হামলায় আহত শিক্ষার্থীরা যখন হাসপাতালে যান, তখন তিনি তাঁদের চিকিৎসা না দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
স্তব্ধ করা ভুক্তভূগীদের জবানবন্দি:
আহত শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন (ছদ্মনাম) জানান:”ছররা গুলিতে রক্তাক্ত শরীরে হাসপাতালে গেলে তৎকালীন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মনিরুজ্জামান ক্ষিপ্ত হন। তিনি ডাক্তারদের বলেন,আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা হবে না, এদের পুলিশে দিন। আমরা প্রাথমিক ড্রেসিংটুকুও পাইনি, উল্টো গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।
“আহত আন্দোলনকারী রাইসুল ইসলাম বলেন:”ডা. মনিরুজ্জামান আমাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে গালিগালাজ করেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে কোনো আহতের জখমি সনদ (Medical Certificate) দেওয়া না হয়, যাতে পরবর্তীতে আমরা আইনি প্রমাণ না রাখতে পারি।
“ভুক্তভোগী এক অভিভাবক বলেন:”
ছেলের পায়ে গুলি লাগার পরও সিট দেওয়া হয়নি। হাসপাতাল ভাঙচুর হতে পারে বলে আমাদের বের করে দেওয়া হয়। তাঁর এই জুলাই-বিরোধী ভূমিকার কারণেই ছাত্র-জনতা পরবর্তীতে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করেছিল।
“অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘৭ নম্বর’ সাংকেতিক কোড:
গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (UHFPO) থাকাকালীন সরকারি ল্যাব অচল করে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। প্রেসক্রিপশনের কোণায় বিশেষ সাংকেতিক চিহ্ন (যেমন- ‘৭ নম্বর’) লিখে রোগীদের নির্দিষ্ট ল্যাবে পাঠাতেন। অন্য কোথাও থেকে টেস্ট করালে রোগীকে গালিগালাজ ও প্রেসক্রিপশন ছুঁড়ে ফেলার একাধিক অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হয়েছিল।
কুশপুত্তলিকা দাহ ও মহাসড়ক অবরোধ:
এই লাগামহীন দুর্নীতির প্রতিবাদে সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে আসে হাসপাতাল রোডে মানববন্ধনের পর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের আশোকাঠী বাসস্ট্যান্ড এলাকা প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। আন্দোলনকারীরা হাসপাতালটিকে তাঁর ‘কমিশন ক্লিনিক’ আখ্যা দিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করে।
শাস্তিমূলক বদলি থেকে সিভিল সার্জন পদে ‘পুরস্কার’:
তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাঁকে গৌরনদী থেকে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক বদলি করে বরিশাল আইএইচটি (IHT)-তে লেকচারার করে এবং পরবর্তীতে তিনি ওএসডি ছিলেন। কিন্তু সেই কলঙ্কিত রেকর্ডকে আড়াল করে, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তাঁকে পুরো বরিশাল জেলার সিভিল সার্জন করায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—স্বাস্থ্য খাতের শুদ্ধি অভিযান কি তবে স্থবির?
বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগে অসন্তোষ:নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশালের একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক বলেন, “যাঁর বিরুদ্ধে টেস্ট বাণিজ্য ও আহত ছাত্রদের চিকিৎসা না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে সিভিল সার্জন করা স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য লজ্জাজনক। এতে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত হবে।”এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় প্রতিনিধিরা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে সিভিল সার্জনের পদ থেকে অবিলম্বে অপসারণ করা না হলে বরিশালে আবারও কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।




