আত্রাইয়ে দশ বছরে বেড়েছে ৫২৫পুকুর কমেছে ৫০হেক্টর আবাদি জমি

ন‌ওগাঁর আত্রাই উপজেলার মোট আয়তন ২৮৫ বর্গ কিলোমিটার। মোট জনসংখ্যা প্রায় ২লাখ ১৪হাজার ৫৯জন। ছোট এই উপজেলায় দিন দিন আবাদি জমির পরিমাণ যে ভাবে কমছে,তাতে ভবিষ্যতে ফসল চাষের জন্য আবাদি জমির প্রকট সংকট দেখা দিতে পারে। তবে ফসলি জমিতে পুকুর খনন এবং বসতঘর নির্মাণের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ দিন দিন কমছে বলছেন কর্মকর্তা। এদিকে এই সমস্যার সমাধানের জন্য কোন ব্যবস্থা গ্ৰহণ করেনা উপজেলা প্রশাসন বলছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তথ্য মতে,১৯৮৪ সালের শুমারি অনুযায়ী উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১১হাজার ৯৪০হেক্টর‌ এবং পতিত জমি ১২হাজার ২২০হেক্টর। প্রতিবছর পতিত জমি বৃদ্ধি পেয়ে গত ২০১৬-২০১৭অর্থ বছরে উপজেলা জুড়ে আবাদি জমির পরিমাণ ২৪হাজার ১০০হেক্টর। ফসলি জমি হ্রাস পেয়ে তা চলতি ২০২৫-২৬অর্থ বছরে জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪হাজার ৫০হেক্টরে। যার মধ্যে এক ফসলি জমির পরিমাণ ১০হাজার ৯৪৫হেক্টর,দু’ফসলি জমির পরিমাণ ৮হাজার ৫৭৫হেক্টর,তিন ফসলি জমির পরিমাণ ৪হাজার ৩৬০হেক্টর এবং চার ফসলি জমির পরিমাণ ১৭০হেক্টর। গত ১০বছরে উপজেলায় প্রায় (৫০হেক্টর) ১২৫একর আবাদি জমি হ্রাস পেয়েছে।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে,গত ২০১৫-২০১৬অর্থ বছরে উপজেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা ছিল ৩হাজার ১৫২টি,মোট আয়তন ছিল ১হাজার ১৩৭হেক্টর। মাছ উৎপাদন হতো ৫হাজার ৯৪৯মেট্রিকটন। চলতি ২০২৫-২৬অর্থ বছরে মোট পুকুরের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩হাজার ৬৭৬টি,আয়তন হয়েছে ১হাজার ৩৯৭হেক্টর। এবং উৎপাদন হচ্ছে ৭হাজার ২৮৯ মেট্রিকটন। দশ বছর ব্যবধানে পুকুর বেড়েছে ৫২৫টি। এবং উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য মতে,গত পাঁচ বছরে উপজেলার কৃষি জমি পরিবর্তন হয়েছে ১২৮একর। তার কারণ হিসেবে অধিদপ্তর বলছে,ফসলি জমিতে পুকুর খনন ও রাস্তাঘাট সম্প্রসারণ হচ্ছে মূল কারণ।
উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়ন,হাট কালুপাড়া ইউনিয়ন,পাঁচুপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে আগে যেখানে ধান,পাট,তিলসহ অন্যান্য কৃষি পণ্য আবাদ হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই সকল জমির চাষাবাদ নেমেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। কারণ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে উপজেলা প্রশাসনকে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিন-রাত ধরে আবাদি জমি ধ্বংস করে চলে মাটি কাটার মহোৎসব। ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল মাটি। ফসলি জমির মাটি ইট তৈরিতেও সুবিধা। মাটির ভালো দাম পাওয়ায় জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন অনেক কৃষক। জমির ফসলে তেমন লাভ না হওয়ায়,মাটি বিক্রি করে পুকুর খনন বেড়েছে অনেক।
সচেতনতা মহল বলেছেন,উপজেলার ফসলি জমি রক্ষা করতে অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা,স্থানীয় সভা,মাইকিং,লিফলেটের মাধ্যমে প্রচারণা,নিয়মিত মনিটরিং টিম গঠন ভূমি অফিস,কৃষি অফিস,পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
এ দিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ প্রসেনজিৎ তালুকদার বলেন,সময়ের পরিক্রমায় মানুষের প্রয়োজনে ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন করনের জন্য আবাদি জমির উপর অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার হয় যা বাড়িঘর, রাস্তা,পুকুর খনন,মসজিদ,স্কুল ইত্যাদি স্থাপনায় ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়াও কৃষি জমি কেটে পুকুর খননে নিরুৎসাহিত করা এবং আবাদি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে কৃষক কে পরামর্শ সহ আবাদি জমির সর্বোচ্চ সঠিক ব্যাবহার ও পতিত না রাখার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাকছুদুর রহমান বলেন,গত এক দশকে উপজেলার ফসলি জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন সম্প্রসারণ,অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিভিন্ন অ-কৃষি খাতে জমির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি সংকুচিত হচ্ছে। এর প্রভাব কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য খাতেও পড়ছে। কৃষিজমি ও জলাশয় সংরক্ষণে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং ভূমি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। টেকসই খাদ্য ও মৎস্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষিজমি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: মনিরুজ্জামান বলেন, আত্রাই উপজেলা ভৌগোলিকভাবে অন্যান্য উপজেলার তুলনায় নিচু হওয়ায় এখানে তিন ফসলি জমির পরিমাণ তুলনামূলক কম। এ কারণে অনেক কৃষক ও জমির মালিক পুকুর খননের দিকে ঝুঁকছেন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন