ভেদরগঞ্জে ইজারার নামে সড়কের ফুটপাতের দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার পৌর এলাকার প্রধান সড়কসহ হাসপাতাল, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সড়কের ফুটপাত দখল করে বসেছে শতাধিক ভাসমান দোকান। এসব দোকান থেকে ইজারার নামে প্রতিদিন টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাসান মোল্লার ছেলে খোকন মোল্লার বিরুদ্ধে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভেদরগঞ্জ বাজার থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দুপাশের ফুটপাত জুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট। ভ্যানগাড়িতে করে কাপড়, জুতা, ফল, সবজি ও মনিহারি পণ্য বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। এর ফলে সড়কে যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে এবং প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

এছাড়াও বাজারের ভেতরের অনেক দোকানদার দোকানের সামনের অংশ ফাঁকা রেখে রাস্তার ওপরই পণ্য সাজিয়ে রাখছেন। অনেক ক্ষেত্রে দোকানের ভেতরের তুলনায় রাস্তার ওপরেই বেশি পণ্য রাখা হয়েছে। ফলে একটি দোকানের সামনে আরেকটি দোকান বসানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি করছেন। এতে করে এ সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

মাঝেমধ্যে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘ সময় আটকে থাকে যানজটে। পথচারীদের চলাচলেও সৃষ্টি হয়েছে চরম ভোগান্তি। এই সড়কে কাপড়, জুতা, ফল ও মনিহারি পণ্যের খুচরা ও পাইকারি মিলিয়ে অন্তত ১৫০টি দোকান বসেছে। কাগজে-কলমে ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটি এখন এতটাই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে যে হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভেদরগঞ্জ পৌরসভা বাজার ইজারা দিলেও ফুটপাত ইজারার আওতায় পড়ে না। কিন্তু প্রতিটি ভাসমান দোকান থেকে ইজারার নামে প্রতিদিন ৫০/১০০ টাকা করে আদায় করছেন খোকন মোল্লা। টাকা দেওয়ার কারণে অনেক দোকানদার মনে করছেন তাদের ফুটপাত দখল বৈধ। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার দুপুর তিনটার দিকে খোকন মোল্লাকে ভাসমান দোকান থেকে টাকা তুলতে দেখা যায়। এসময় গোপন ক্যামেরায় চাঁদা আদায়ের ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলা ডাকবাংলা এলাকা থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত বিভিন্ন দোকান থেকে তিনি টাকা সংগ্রহ করছেন।

এক পর্যায়ে এক ভাসমান ঔষধ বিক্রেতা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে হুমকি দিতে দেখা যায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে প্রকাশ্যে টাকা আদায় চললেও প্রশাসনের কোনো নজরদারি দেখা যায়নি। পরে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি দাবি করেন, পৌরসভা থেকে রাস্তা ইজারা নিয়েছেন। তবে ইজারার কাগজপত্র দেখাতে বলা হলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।

পথচারী আতিকুল ইসলাম বলেন, “এখানে ফুটপাত দিয়ে ঠিকমতো হাঁটা যায় না। দোকানদাররা রাস্তা দখল করে পণ্য সাজিয়ে রেখেছেন। দুপাশে ভাসমান দোকান থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও যেতে পারে না।”

ভেদরগঞ্জ বাজারে কেনাকাটা করতে এসে ক্রেতা ইভা রহমান বলেন, “এই দোকানগুলোর কারণে বড় রাস্তাটি এখন সরু গলিতে পরিণত হয়েছে। ভিড় বাড়লে ধাক্কাধাক্কি করে চলতে হয়। নারী ক্রেতারা এখানে এসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। পৌর কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও একদিন পরই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।”

বৃহস্পতিবার বিকেলে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রোগী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন অ্যাম্বুলেন্স চালক রাজু মিয়া। তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে ভেদরগঞ্জ বাজার হয়ে মহাসড়কে পৌঁছাতে আধা কিলোমিটার পথ যেতে তার প্রায় ৪০ মিনিট সময় লেগেছে।

তিনি বলেন, “এই পথে দীর্ঘদিন ধরে রোগী নিয়ে যাতায়াত করি। দিনের বেশিরভাগ সময়ই যানজট লেগে থাকে। এর প্রধান কারণ সড়কের ওপর অবৈধ দোকান। একজন রোগী যদি এখানেই ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আটকে থাকে, তাহলে ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।”

প্রায় দুই বছর ধরে ভ্যানে করে শিশুদের কাপড় বিক্রি করছেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, “আমরা নিয়মিত ভাড়া দিয়ে এখানে দোকান বসাই। খোকন মোল্লা প্রতিদিন ৫০ টাকা করে নেয়। যদি দোকান অবৈধ হয় তাহলে টাকা নেয় কেন?”

রশিদ দেওয়া হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, কোনো রশিদ দেয় না। সবকিছু খোকন মোল্লাই ম্যানেজ করে। এখানে প্রায় ১৫০টির বেশি দোকান আছে, সবাই একইভাবে টাকা দিয়ে ব্যবসা করছে।”

ভাসমান ফল বিক্রেতা রবিউল হাসান বলেন, “বাজার থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত রাস্তা খোকন ভাই ইজারা নিয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। তাই দোকান বসাতে হলে প্রতিদিন ১০০ টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে এখানে বসতে দেওয়া হয় না।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খোকন মোল্লা বলেন, “আমি পৌরসভা থেকে রাস্তা ইজারা নিয়েছি। ভেদরগঞ্জ বাজার থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত যত ভাসমান দোকান বসবে সব আমার ইজারার মধ্যে।”

তবে ইজারার কাগজপত্র দেখতে চাইলে এবং ফুটপাত থেকে টাকা নেওয়ার বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।

ভেদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল বাসার বলেন, “সড়কের দুপাশে ভাসমান দোকান থেকে ইজারার নামে চাঁদাবাজি করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌরসভার প্রশাসক কে. এম. রাফসান রাব্বি বলেন, “সড়ক ইজারা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। কেউ যদি সড়কের দুপাশে অবৈধ দোকান বসিয়ে টাকা আদায় করে থাকে, তা চাঁদাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। বিষয়টি প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, “সড়কের দুপাশে অবৈধ দোকান বসার সুযোগ নেই। কেউ অবৈধভাবে দোকান বসালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুব শিগগিরই সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

 

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

আসন্ন ২০২৬-২৭ বাজেটে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাজেট বৃদ্দির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

চট্টগ্রাম, ৪ জুন ২০২৬: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা, জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ