যেভাবে ধর্মজ্যোতি চাকমা খাগড়াছড়ি আসনে প্রার্থী হলেন

ধর্মজ্যোতি চাকমা খাগড়াছড়ির সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ নং খাগড়াছড়ি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যেভাবে তিনি সুশীল সমাজের মনোনীত প্রার্থী হলেন তা নিচে আলোচনা করা হল:
• ৮ই নভেম্বর ২০২৫, প্রত্যাগত শরণার্থী নেতা সন্তোষিত চাকমার (তাকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের খুবই ঘনিষ্ট বলে মনে করা হয়) উদ্যোগে তার কার্যালয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একজন সৎ, যোগ্য ও প্রতিবাদী প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য একটি মিটিং করা হয়। উক্ত মিটিঙে পরবর্তী ১৫ নভেম্বর জনপ্রতিনিধি ও ট্রাডিশনাল নেতাদের নিয়ে একটি সভা আহ্বান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
• ১৫ নভেম্বর ২০২৫, আহূত সভায় ৭ জন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার, হেডম্যান ও কার্বারিসহ খাগড়াছড়ির নয়টি উপজেলা থেকে ৭০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত হন। উক্ত সভায় যে সব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তার মধ্যে হলো: ১) সাবেক অধ্যক্ষ বোধিসত্ব দেওয়ানকে আহ্বায়ক ও তৃপ্তিময় চাকমাকে সদস্য সচিব নির্বাচিত করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট “প্রার্থী যাচাই-বাছাই ও যোগাযোগ কমিটি” গঠন। ২) প্রার্থী মনোনীত করার প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে যোগাযোগ ও মতবিনিময় করা। ৩) প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য ৭ জন প্রার্থীর তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এই সাত জনের মধ্যে সমীরণ দেওয়ানের নাম ছিল না। (তবে পরে আরও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম যুক্ত করা হয়, যেমন সোনারতন চাকমা, সুপার জ্যোতি চাকমা ইত্যাদি।)
• ১৮ নভেম্বর ২০২৫, যাচাই-বাছাই কমিটির প্রথম বৈঠক। ৭ জনের মধ্যে দুই জন নিজেদের নাম প্রত্যাহার করেন; দু’জন নির্বাচন বিধি মোতাবেক প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। সুতরাং বাকি থাকেন তিন জন: সর্বোত্তম চাকমা, সন্তোষিত চাকমা ও ধর্মজ্যোতি চাকমা।
• ২০ নভেম্বর ২০২৫ থেকে যাচাই-বাছাই কমিটি খাগড়াছড়ির জুম্ম রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করেন এবং সকল দলের পূর্ণ সমর্থন লাভ করেন। জেএসএস এম. এন. লারমা দল জানিয়ে দেয় যে, তারা সুশীল সমাজের যাচাই-বাছাই কমিটি যাকে প্রার্থী হিসেবে বাছাই করবে, তারা তাকে পূর্ণ সমর্থন দেবে। ইউপিডিএফও একই রকম সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। এছাড়া অনেকে যাচাই-বাছাই কমিটিকে তাদের ভূমিকার জন্য সাধুবাদ দেয়।
• ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, জুম্ম রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন নিয়ে যাচাই-বাছাই কমিটি আগ্রহী প্রার্থীগণকে নমিনেশন পেপার / মনোনয়নপত্র সংগ্রহের অনুমতি দেয়। সন্তোষিত চাকমা, ধর্মজ্যোতি চাকমা ও সোনারতন চাকমা  মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে সর্বোত্তম চাকমা তার বিরুদ্ধে মামলার জটিলতা থাকায় এবং সুপারজ্যোতি চাকমা ব্যক্তিগত কারণে মনোনয়ন সংগ্রহ করবেন না বলে জানিয়ে দেন।
• ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, যাচাই-বাছাই কমিটির নেতৃবৃন্দ রাঙ্গামাটিতে জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপের নেতা সন্তু লারমার সাথে সাক্ষাত করেন। সন্তু লারমা সুশীল সমাজের এই মহৎ উদ্যোগকে সমর্থন না দিয়ে বরং তাদেরকে তাদের কাজ গুটিয়ে ফেলে বিএনপি নেতা ও কুখ্যাত দালাল সমীরণ দেওয়ানের পক্ষে কাজ করার জন্য চাপ দেন।
• ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, সন্তু গ্রুপের প্রবল চাপে সুশীল সমাজের গঠিত প্রার্থী যাচাই-বাছাই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
• ধর্ম জ্যোতি চাকমার মনোনয়ন বৈধ হয়। সোনারতন চাকমা ও সন্তোষিত চাকমার মনোনয়ন বাতিল হয়। তবে সোনারতন চাকমা নির্বাচন কমিশনে আপিল করে তার প্রার্থীতা ফিরে পান। তা সত্বেও তিনি ধর্মজ্যোতি চাকমাকে সমর্থন দিয়ে শেষ বেলায় মনোয়নয়ন প্রত্যাহার করে নেন।
কয়েকটি বিষয় ও প্রশ্ন:
এখানে কয়েকটি বিষয় ও প্রশ্ন সামনে চলে আসে।
প্রথমত, জেএসএস সন্তু গ্রুপ প্রচার করছে সুশীল সমাজের গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটি আসলে ইউপিডিএফের প্রক্সি। এর চাইতে মিথ্যাচার আর কিছুই হতে পারে না। একজন যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ যিনি নেন – সন্তোষিত চাকমা – তিনি জেএসএস সন্তু লারমা দলের সাথেই বেশি ঘনিষ্ট। আর সাবেক অধ্যক্ষ বোধিসত্ব দেওয়ান ও তৃপ্তিময় চাকমা কোন দলের সাথে যুক্ত নন। কখনও কোন দলের প্রোগ্রামে অংশ নেননি। কেউ সে ধরনের প্রমাণও দিতে পারবে না। তাদেরকে ‘ইউপিডিএফ’ বলে চিহ্নিত করাটাই তো ‘ট্যাগ’ লাগানোর সংস্কৃতি, যা সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারে না। খাগড়াছড়ির সুশীল সমাজ আসলেই একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কাজ করেছে। অথচ জেএসএস সন্তু গ্রুপ তাদের সেই মহৎ উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখেছে এবং কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছে। প্রশ্ন হলো, যেখানে সুশীল সমাজকে এ ধরনের মহৎ কাজে উৎসাহিত করা উচিত, সেখানে সন্তু গ্রুপ কেন সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দিয়ে তাদেরকে হেয়, অপমানিত ও নিরুৎসাহিত করেছে?
দ্বিতীয়ত, খাগড়াছড়ির সুশীল সমাজকে হেয় ও অপমানিত করে জেএসএস সন্তু গ্রুপ প্রকৃতপক্ষে খাগড়াছড়িবাসীকেই হেয় ও অপমানিত করেছেন। সন্তু লারমা ভোটে প্রার্থী দাঁড় করাতে চান, অথচ এলাকার সম্মানিত ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের মতামতকে তোয়াক্কা করেন না। এ কেমন কথা?!? সাত জন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ যে ৭০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছিলেন, তাদের মতামতের কোন দাম থাকবে না, তাদের মহৎ উদ্যোগ গুটিয়ে নিজের পছন্দীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিতে বাধ্য করার মত জোরজবরদস্তি কোন আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি মেনে নিতে পারেন না। মনে রাখা দরকার, এই সুশীল সমাজ একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করেছেন। অন্যদিকে সন্তু লারমা তার একক সিদ্ধান্তে সমীরণ দেওয়ানকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। সন্তু লারমার এই অগণতান্ত্রিক, ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারী ও একনায়কসুলভ আচরণই হলো জুম্ম জাতির আন্দোলন সংগ্রামে সকল সমস্যার মূল কারণ। সুশীল সমাজের মহৎ উদ্যোগকে সমর্থন করলে, তাদের গণতান্ত্রিক বাছাই প্রক্রিয়াকে উদার মনে মেনে নিলে তার অসুবিধাটা কী ছিল?
তৃতীয়ত, এটা একেবারেই পরিষ্কার যে, ধর্মজ্যোতি চাকমা খাগড়াছড়ির সুশীল সমাজের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রার্থী হয়েছেন। যাচাই-বাছাই কমিটিতে তার নাম কমিটির সদস্যরাই প্রস্তাব করেছেন। ইউপিডিএফ পরের দিকে দু’একজনের নাম প্রস্তাব করে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা তালিকাভুক্ত হয়নি। সে নিয়ে ইউপিডিএফ কোন উচ্চবাচ্যও করেনি, কোন ধরনের চাপ প্রয়োগ তো দূরের কথা। সুশীল সমাজের মতামতের প্রতি সম্মান জানিয়েছে। রায় দেয়ার মালিক ভোটারগণ, তাদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। তাই ধর্মজ্যোতি চাকমাকে ইউপিডিএফের প্রার্থী বলে জেএসএস সন্তু গ্রুপের পক্ষ থেকে প্রচারণা হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছাড়া কিছুই নয়।
চতুর্থত, সুশীল সমাজের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার প্রতি জেএসএস সন্তু গ্রুপ ছাড়া অন্য সব জুম্ম দল সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এমনকি সংঘাত ও বৈষম্য বিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলনও সমর্থন দিয়েছে। জেএসএস সন্তু গ্রুপ যদি এভাবে জনমতের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখায়, ফ্যাসিস্ট আচরণ করে, তাহলে জনগণ কেন তাদের নেতৃত্ব মেনে নেবে, কেন তাদের কথা শুনবে? জেএসএস নেতা সন্তু লারমা এভাবে জনগণের সমর্থন ও সহানুভূতি হারাচ্ছেন।
পঞ্চমত, প্রার্থীদের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যাবে সমীরণ দেওয়ান সব দিক দিয়ে ধর্মজ্যোতি চাকমার চাইতে দুর্বল ও নিকৃষ্ট হবেন। তিনি রাজনীতিতে অনেক বার রং বদল করেছেন, সরকার-সেনাবাহিনীর দালাল হিসেবে তিনি কুখ্যাত। লোগাং গণহত্যার পর তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়, লোকে আজও তার দালালির ইতিহাস ভুলতে পারেনি। খোদ জেএসএস তাকে দালাল হিসেবে অভিহিত করেছিল। এখনও তিনি যে দলে আছেন, সেই দলটির জুম্ম-বিরোধী ইতিহাসও অনেক পুরোনো। তিনি এখনও বিএনপিতে আছেন বলে নিজেই সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন। এ অবস্থায় কোন যুক্তিতে জেএসএস সন্তু গ্রুপ তাকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তা জনগণের কাছে বোধগম্য নয়। আসলে জাতীয় বা জনগণের স্বার্থে নয়, আগামী (বিএনপি?) সরকারের সময় আঞ্চলিক পরিষদের গদি ধরে রাখতেই জেএসএস সন্তু গ্রুপ সংকীর্ণ স্বার্থে ওয়াদুদ ভূঁইয়ার “ভাই” সমীরণ দেওয়ানকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিচ্ছে।
পরিশেষে জেএসএস সন্তু গ্রুপকে অনুরোধ, আপনারা আপনাদের ভুল সিদ্ধান্ত বাতিল করুন। খাগড়াছড়ির সুশীল সমাজ তথা খাগড়াছড়িবাসীর মতামতের প্রতি সম্মান দেখান এবং ধর্মজ্যোতি চাকমাকে জয়যুক্ত করতে ভূমিকা রাখুন। এতে আপনারা হেয় প্রতিপন্ন হবেন না, বরং এতে জাতীয় একতা ও আন্দোলনের প্রতি আপনাদের সদিচ্ছা প্রকাশ পাবে।
লেখক: অংগ্য মারমা,
সংগঠক, ইউপিডিএফ, খাগড়াছড়ি ইউনিট

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

আসন্ন ২০২৬-২৭ বাজেটে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাজেট বৃদ্দির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

চট্টগ্রাম, ৪ জুন ২০২৬: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা, জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ