দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় নদীভাঙনের তীব্রতায় আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ শতাধিক পরিবারের বসতভিটা এখন চরম ঝুঁকিতে। প্রতিদিনই নদী একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে । আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপাড়ের মানুষেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই করতোয়া নদীর ভাঙন চললেও কার্যকর কোনো স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এবার টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নদীর পাড় ধসে পানি এখন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের একেবারে কাছে পৌঁছে গেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘর চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিলে মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে পুরো প্রকল্পের ঘরসহ আশেপাশে বসতভিটা।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পাড়ের বড় বড় অংশ ধসে পড়ছে। কোথাও কোথাও মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। শিশুদের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আতঙ্কে অনেকে রাতে জেগে থাকছেন। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশাপাশি আশপাশের শতাধিক পরিবারও গৃহহীন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আদরী রাণীর চোখে এখন শুধু আতঙ্ক। তিনি বলেন, “আমরা খুব কষ্টে আছি। আমাদের নিজের কোনো জমি নেই। আগে এখানেও আরও কয়েকটি ঘর ছিল, সেগুলো নদীতে চলে গেছে। গত ১৫ থেকে ২০ দিনে ভাঙন অনেক বেড়েছে। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে সব সময় ভয়ে থাকি। কখন ঘর ভেঙে নদীতে পড়ে যায়, সেই আতঙ্কে রান্না করেও ঠিকমতো খেতে পারি না।”
একই আশঙ্কার কথা জানালেন সুরাইয়া বেগম। তিনি বলেন, “নদীভাঙনের কারণে ঘর খুলে সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাইনি। নতুন করে ঘর বানানোর মতো টাকা নেই, জমি কেনারও সামর্থ্য নেই। কয়েক দিন আগেই পাশের ঘর নদীতে চলে গেছে। এখন আমাদের পালার অপেক্ষা।”
আদরী রাণী আরও বলেন, “বৃষ্টি শুরু হলেই বুক ধড়ফড় করে। সরকার অনেক কষ্টে আমাদের এই ঘর দিয়েছে। এখন সেই ঘরই হারানোর ভয়। রাতে ঘুমাতে পারি না। নিরাপদ জায়গায় আমাদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ভাঙনরোধে স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করতে হবে। অন্যথায় যে কোনো সময় শতাধিক পরিবার আবারও ঠিকানাহীন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
তবে নদীপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই, প্রশাসনের এই উদ্যোগ কি ভাঙনের চেয়ে দ্রুত হবে? নাকি করতোয়ার স্রোত আবারও কেড়ে নেবে শেষ আশ্রয়টুকুও? এখন সেই উত্তরই খুঁজছে করতোয়া তীরের শতাধিক পরিবার।




