ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গণহত্যা সংঘটিত করার সরাসরি অভিযোগ রয়েছে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা এসপি আলমগীর হোসেনের (বিপি নং- ৭৯০৬১১১১৪৩) বিরুদ্ধে। পূর্বতন ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে একের পর এক পৈশাচিক অপরাধের দায়ে সরকারি তদন্তে চাকরি থেকে চূড়ান্ত বরখাস্তের সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও এই কর্মকর্তা এখনও বহাল তবিয়তে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।
গণহত্যাকারী ও অপরাধের বরপুত্র হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার এমন অজেয় অবস্থান বর্তমান সরকারের সংস্কার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকে জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জুলাই গণহত্যার মাঠে ফ্রন্টলাইন শুটার
২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন স্বৈরাচারী সরকার পতনের দাবিতে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে, তখন ডিএমপির ডিসি (হেডকোয়ার্টার্স) হিসেবে নেপথ্যে থেকে দমন-পীড়নের মূল সমন্বয়কারীদের একজন ছিলেন আলমগীর হোসেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি কেবল নির্দেশদাতাই ছিলেন না; বরং স্বহস্তে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে নিয়ে রাজধানী ঢাকাকে রক্তাক্ত করতে ফ্রন্টলাইনে থেকে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছেন। ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো এক অদৃশ্য খুঁটির জোরে তিনি এখনও পার পেয়ে যাচ্ছেন।
ধর্ষণ ও চোখ অন্ধ করার বর্বরতা
অনুসন্ধানে জানা যায়, জুলাই গণহত্যার অনেক আগেই আলমগীর হোসেনের অপরাধের খতিয়ান দীর্ঘ রূপ নিয়েছিল। ২০১১ সালে মৌলভীবাজার জেলায় কর্মরত থাকাকালীন এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ, গুমের চেষ্টা এবং রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালান তিনি।
সবচেয়ে পৈশাচিক ঘটনা ঘটে তাঁর দাপ্তরিক এলাকায়, যেখানে এক নারীকে পাশবিক ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এই জঘন্যতম অপরাধের প্রতিবাদ করায় ভুক্তভোগীর স্বামীর চোখে কলম দিয়ে খুঁচিয়ে অন্ধ করে দেওয়ার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালান তিনি।
এসব চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) পৃথকভাবে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রতিটি তদন্তেই আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয় এবং তাঁকে চাকরি থেকে চূড়ান্ত বরখাস্তের (Dismissal from Service) আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করা হয়।
পিএসসি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বরখাস্তের চূড়ান্ত সুপারিশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পার পেয়ে যান এই কর্মকর্তা। তৎকালীন প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং বিতর্কিত ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের সমন্বয়ে গঠিত অপরাধী সিন্ডিকেটের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন আলমগীর। ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং পুলিশ ক্যাডারের (২৫তম ব্যাচ) কোটার প্রভাব খাটিয়ে তিনি একের পর এক গুরুতর অপরাধ করেও পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন বাগিয়ে নেন।
ফ্যাসিবাদ পতনের পর বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান চালানো হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন এসপি আলমগীর। বর্তমানে তিনি রংপুর রেঞ্জের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগে বীরদর্পে দায়িত্ব পালন করছেন।
তদন্তে প্রমাণিত একজন ধর্ষক, অপহরণকারী এবং জুলাই গণহত্যার সরাসরি মাঠপর্যায়ের ঘাতক কীভাবে এখনও পুলিশের মতো সংবেদনশীল বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকেন—তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
জনসাধারণ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবি—পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে এই কুখ্যাত অপরাধীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।




