২২ হাজার শিক্ষার্থী, নেই ৮৫ প্রধান শিক্ষক কয়রার প্রাথমিক শিক্ষায় চরম জনবল সংকট

খুলনার কয়রা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের জনবল সংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় উপজেলার অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কার্যত ভারপ্রাপ্তদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষার মান, বিদ্যালয় তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কয়রা উপজেলায় ১৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৮টি অন্যান্য বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকের ৮৫টি পদ ও সহকারী শিক্ষকের ৪২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৮৫টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, অফিস পরিচালনা, সরকারি দাপ্তরিক কাজ, শিক্ষকদের তদারকি, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে শিক্ষাদানের জন্য যে সময় ও মনোযোগ প্রয়োজন, তা ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ২২ হাজার ৮০৬ জন। অথচ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের এই সংকট শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকর জানান, ২০১৩ সালে সর্বশেষ সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল। এরপর আর কোনো নিয়োগ হয়নি।

তিনি বলেন, বর্তমানে ৮৫টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এর মধ্যে ১৬ জন চলতি দায়িত্বে রয়েছেন। কিছু পদে পদায়নের কথা ছিল, কিন্তু মামলা-জটিলতার কারণে সেটিও সম্ভব হয়নি। এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি ইস্যু। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সংকট শুধু বিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও প্রয়োজনীয় জনবল নেই।

বর্তমানে ৫টি সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদের মধ্যে ৩টি শূন্য। এছাড়া ৪টি অফিস সহকারীর সবগুলো পদই শূন্য।

এ বিষয়ে তপন কুমার কর্মকর বলেন, আমাদের নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করতে হয়, বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হয় এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু এত কম জনবল দিয়ে এসব দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব পালন করেন প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে এই পদগুলো শূন্য থাকায়—বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। নিয়মিত একাডেমিক তদারকি ব্যাহত হচ্ছে। সহকারী শিক্ষকদের ওপর দ্বৈত দায়িত্বের চাপ বাড়ছে। সরকারি প্রকল্প ও দাপ্তরিক কাজ সময়মতো সম্পন্ন করতে সমস্যা হচ্ছে।শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সময়ও কমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি উপজেলার প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকা শুধু প্রশাসনিক সংকট নয়, এটি শিক্ষার মানের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, দীর্ঘদিনের মামলা-জটিলতা ও নিয়োগ স্থবিরতা দূর করে দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে উপজেলা শিক্ষা অফিসেও প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

অন্যথায়, কয়রার ২২ হাজার ৮০৬ শিক্ষার্থীর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে, যা জাতীয় শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

নাচোলে প্রধান শিক্ষক জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস, সংবাদ সংগ্রহকালে দুই সাংবাদিক লাঞ্ছিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার কসবা উজিরপুর দরগা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে

দিল্লিতে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে উত্তেজনা, পুলিশের লাঠিচার্জ; বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা নিয়ে আলোচনা

নয়াদিল্লি, ২০ জুলাই ২০২৬: ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি