ডাক্তার সংকটে ধুঁকছে মোংলার চিলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র: চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হাজারো মানুষ, ঝুঁকিতে মা ও নবজাতক

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নে অবস্থিত ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি), আয়া, পিয়ন, নাইট গার্ড ও প্যাথলজি কর্মীর পদ শূন্য থাকায় প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রে বর্তমানে কোনো নিয়মিত চিকিৎসক কর্মরত নেই। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা একজন স্বাস্থ্যকর্মী উপজেলার চারটি ইউনিয়নের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে রোগীদের প্রয়োজনীয় সময়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে শত রোগী চিকিৎসার জন্য কেন্দ্রে এলেও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সরবরাহও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং তারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
গর্ভবতী নারীদের অভিযোগ, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়েও তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় তাদের প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে। এছাড়া এলাকার সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে যাতায়াতের সময় গর্ভবতীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। স্থানীয়দের দাবি, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে মা ও গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি বর্তমানে চিকিৎসক সংকটের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য সরবরাহ করা মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার না হয়ে পড়ে রয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসক না থাকায় এসব সরকারি সম্পদ জনসেবার পরিবর্তে অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
তাদের ভাষায়, “ভবন আছে, যন্ত্রপাতি আছে; কিন্তু ডাক্তার নেই। ফলে কোটি টাকার এই প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসছে না।”
এলাকাবাসীর আরও দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত চিকিৎসক না থাকায় কেন্দ্রটির সেবাকার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, গত এক বছরে কেন্দ্রে সিভিল সার্জন বা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কোনো কার্যকর পরিদর্শন চোখে পড়েনি। তারা দ্রুত একজন নিয়মিত চিকিৎসক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নের দাবি জানান।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও চিলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা অসীম কুমার পাল বলেন, “আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। একই সঙ্গে চারটি ইউনিয়নের দায়িত্বে রয়েছি। সীমিত জনবল নিয়ে নিয়মিত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
এ বিষয়ে মোংলা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, “আমি সম্প্রতি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। যোগদানের পর চিলা ইউনিয়নের ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি পরিদর্শন করি। সেখানে অনুমোদিত জনবলের অধিকাংশ পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে সেবাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য গত মাসে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আমরা তাদের নির্দেশনা ও পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছি। জনবল নিয়োগ হলে বিদ্যমান অবকাঠামো ও লজিস্টিক সুবিধা ব্যবহার করে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি বর্তমানে জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। দ্রুত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে এলাকার হাজারো মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে আরও বেশি বঞ্চিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

‎ব্রাহ্মণপাড়ায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাস্তা সংস্কার করে জনদূর্ভোগ লাঘব করলেন চেয়ারম্যান প্রার্থী মোঃ আরিফুল ইসলাম

‎কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের কল্পবাস ব্র্যাক সংলগ্ন ডিপ

​লামায় পৈত্রিক সম্পত্তি জবরদখল ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে, দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ভুক্তভোগী নারী

বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী মৌজায় পৈত্রিক ও নিজস্ব খরিদা সম্পত্তি