বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের লড়াই সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন এক গল্প। দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত একবারও জয়ের দেখা পায়নি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। বরং নরওয়েই ধরে রেখেছে আধিপত্য।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় ব্রাজিলকে। ম্যাচে নরওয়ের হয়ে জোড়া গোল করেন আর্লিং হালান্ড। ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি আসে ইনজুরি সময়ে নেইমারের পেনাল্টি থেকে। এই জয়ে নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ইতিহাস গড়ে।

দুই দলের মুখোমুখি ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মোট পাঁচবার দেখা হয়েছে। এর মধ্যে নরওয়ে জিতেছে তিনটি ম্যাচ, আর দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ব্রাজিল এখনও নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের স্বাদ পায়নি।
দুই দলের পূর্ববর্তী ম্যাচগুলোর ফলাফল:
২৮ জুলাই ১৯৮৮: নরওয়ে ১-১ ব্রাজিল (প্রীতি ম্যাচ)
৩০ মে ১৯৯৭: নরওয়ে ৪-২ ব্রাজিল (প্রীতি ম্যাচ)
২৩ জুন ১৯৯৮: ব্রাজিল ১-২ নরওয়ে (ফিফা বিশ্বকাপ)
১৬ আগস্ট ২০০৬: নরওয়ে ১-১ ব্রাজিল (প্রীতি ম্যাচ)
৫ জুলাই ২০২৬: ব্রাজিল ১-২ নরওয়ে (ফিফা বিশ্বকাপ, শেষ ষোলো)

বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ের ২-১ ব্যবধানে জয়টি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন। সেই ম্যাচে শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠেছিল নরওয়ে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও একই প্রতিপক্ষকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি।

ভাগ্যবিধাতা সাথে থাকলে ফলাফল অন্য হতেও পারতো। ব্রুনো গিমারায়েস প্রথমার্ধে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন। গোলটি হলে ব্রাজিল ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যেত এবং ম্যাচের গতি বদলে যেতে পারত। অন্যদিকে,গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ৭৯ মিনিটে আর্লিং হালান্ডের প্রথম গোলের সময় তাকে যথেষ্ট শক্তভাবে মার্ক করতেও পারেন নি।বিশ্ব ফুটবল গবেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে তিনি আরও ভালো রক্ষণ করতে পারতেন। এদিকে,এন্দ্রিক দ্বিতীয়ার্ধে একান্ত সুযোগ (ওয়ান-অন-ওয়ান) কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। সেই সুযোগ থেকেও গোল হলে ব্রাজিল আবারও এগিয়ে যেতে পারত। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দলটি আক্রমণে পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি এবং কৌশলগতভাবে কিছুটা রক্ষণাত্মক ছিল। বদলি খেলোয়াড় নামানো ও ম্যাচ পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে,হালান্ডের র্দূদান্ত পারফর্মেন্সে জয় ছিনিয়ে নেন। প্রথমত, হালান্ড সবসময় ব্রাজিলের রক্ষণভাগের শেষ লাইনের কাছে অবস্থান নিয়ে ডিফেন্ডারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। ফলে ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা স্বাভাবিকভাবে ওপরে উঠে খেলতে পারেননি এবং রক্ষণে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বাধ্য হন।দ্বিতীয়ত, তাঁর অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট ছিল অসাধারণ। বল ছাড়াই দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করে তিনি বারবার ডিফেন্ডারদের অবস্থান এলোমেলো করে দেন। এতে তাঁর সতীর্থদের জন্যও আক্রমণে জায়গা তৈরি হয়।তৃতীয়ত,প্রতিআক্রমণের সময় হালান্ডের গতি ছিল নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দ্রুত গতিতে সামনে এগিয়ে গিয়ে ব্রাজিলের রক্ষণকে চাপে ফেলেন। তাঁর এই গতিই প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।চতুর্থত, গোলের সামনে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল প্রশংসনীয়। সুযোগ পেলে অযথা সময় নষ্ট না করে দ্রুত শট নেওয়ার মানসিকতা নরওয়ের আক্রমণকে আরও কার্যকর করে তোলে।

আরলিং হালান্ড নরওয়ের ২–১ ব্যবধানে জয়ের নায়ক ছিলেন। তিনি ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে প্রথম গোল এবং ৯০তম মিনিটে দ্বিতীয় গোল করে নরওয়েকে ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ৭৯তম মিনিটে দীর্ঘ সময় ধরে ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে চাপে রাখার পর হালান্ড বক্সের ভেতরে দারুণ অবস্থান নেন। সতীর্থের নিখুঁত ক্রসকে শক্তিশালী হেডে জালে পাঠিয়ে তিনি ম্যাচের অচলাবস্থা ভাঙেন। এই গোলটি তার অবস্থান নির্বাচন, আকাশে আধিপত্য এবং ফিনিশিং দক্ষতার অসাধারণ উদাহরণ। ব্রাজিল সমতায় ফেরার চেষ্টা করছিল কিন্তু ঠিক ৯০ মিনিটের সময় দ্রুতগতির আক্রমণে হালান্ড বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় নিচু শটে গোল করেন। এই গোলটি কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় এবং ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তনের আশা শেষ করে দেয়।

পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক ফলাফল প্রমাণ করে, বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল যত বড় শক্তিই হোক না কেন, নরওয়ের বিপক্ষে তারা এখনো জয়ের খাতা খুলতে পারেনি। তাই এই দ্বৈরথকে অনেকেই ব্রাজিলের জন্য ‘অমীমাংসিত ধাঁধা’ বলেই আখ্যায়িত করছেন।