কাঁধের টিউমার অপারেশন করাতে গিয়ে মারা গেছেন কৃষক ওসমান গণি (৫৫)। একই চিকিৎসকের ভুল অপারেশনের শিকার হয়ে পঙ্গু হওয়ার পথে আরো তিনজন নারী-পুরুষ। ক্ষত স্থানে পচন ধরেছে। দূর্বিসহ যন্ত্রনা নিয়ে এখন বাড়ীর বিছানায় কাতরাচ্ছেন এসব রোগী। পা হারানো শঙ্কা নিয়ে এদের মধ্যে কেউ পুনরায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, অর্থের অভাবে কেউ নিতে পারছেন না চিকিৎসা।
ভুল অস্ত্রোপচার করায় চিকিৎসক জাহিদুলের বিচার দাবি করে শনিবার মানববন্ধন-বিক্ষোভ করেছে ভুক্তভোগি এসব রোগীর স্বজনেরা। জাহিদুল ইসলাম গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেন হাড়-জোড় রোগ বিশেষজ্ঞ (অর্থপেডিক)। এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সিজারিয়ান অপারেশনে প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধ্যানে গিয়ে উঠে সেই ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার ভয়াল চিত্র।
নাজিমুদ্দিনের পা থেকে বের হচ্ছে অনড়গল পুঁজ
গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় মধ্যমপাড়া মহল্লার বাসিন্দা নাজিমুদ্দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ডান পায়ের হাটুতে আঘাত পান । ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে বনপাড়া জাহেদা ক্লিনিকে তার অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসক জাহিদুল। ৫দিন পর থেকেই ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে থাকে। এখন অনড়গল পুঁজ বের হচ্ছে। গতকাল শনিবার নাজিমুদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, ব্যান্ডেজ জড়ানো পা নিয়ে ব্যথায় কাঁদছেন তিনি। ব্যান্ডেজ খুলে দিতেই পুঁজ বের হতে শুরু করলো।
চোখ মুছতে মুছতে নাজিমুদ্দিন কালবেলাকে বলেন, বছরখানেক আগে হাটুতে সামান্য আঘাত পেয়েছিলেন। চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম জাহেদা ক্লিনিকে নিয়ে অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের সপ্তাহ খানেক পর থেকেই ক্ষতস্থানে পচন শুরু হয়। পচন রোধে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করে ৮ মাস ওই চিকিৎসকের কাছে ড্রেসিং করেছেন। তাতে উন্নতি না হয়ে পচন আরো বেড়েছে। এখন তিনি অধিক খরচে অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বিকে দামের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অধ্যাপক বিকে দাম বলেন, নাজিমুদ্দিনের অস্ত্রোপচার সফল ছিল না। নানা ধরণের ত্রুটি ছিল। এখন পা ঠিক রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। পচন রোধ করা না গেলে পা কেটে ফেলতে হতে পারে।
ভুল অস্ত্রোপচারে পঙ্গত্ববরণ জহুরা বেগমের
নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে চিকিৎসক জাহিদুলের কাছে বাম হাতের অস্ত্রোপচার করান বড়াইগ্রাম উপজেলার ভবানিপুর-আটঘরিয়া গ্রামের চা বিক্রেতা আবুল বাশারের স্ত্রী বৃদ্ধা জহুরা বেগম (৬০)। তিনি বলেন, পা পিছলে পড়ে গিয়ে বাম হাতের কবজির কাছে হাড় ভেঙে যায়। জাহেদা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করার পর থেকে তার হাতেও ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ হাজার টাকা দিয়ে অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশন ঠিক হতে অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। ওই হাত নিয়ে তিনি আর কাজ করতে পারেন না। কবজিও ভাজ হয়না।
জহুরা বেগমের স্বামী আবুল বাশার কালবেলাকে বলেন, ভুল অস্ত্রোপচারের পর স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে তিনি নিঃশ^ হয়ে পড়েছেন। রাত এলেই অসহ্য যন্ত্রণায় ছটছট করেন তাঁর স্ত্রী। চিকিৎসক জাহিদের কারণে তার স্ত্রীর পঙ্গত্ববরণ করতে হয়েছে। তিনি ওই চিকিৎসকের বিচার দাবি করেন।
টিউমার অপারেশনে ওসমান গণির মৃত্যু
জুন মাসের শুরুর দিকে ঘারের ছোট্ট একটি টিউমার অস্ত্রোপচারের জন্য ওসমান গুণিকে (৬৫) জাহেদা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল। সন্ধ্যার পর অস্ত্রোপচার শুরু করেন চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম। আধাঘন্টা পর থিয়েটার থেকে চিকিৎসক বের হয়ে গা ঢাকা দেন। এরপর আর রোগীর কোনো সারা শব্দ ছিল না। এক পর্যায়ে বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে জানা যায় ওসমান গণি ক্লিনিকের অস্ত্রোপচার কক্ষেই মারা গেছেন। আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন নিহতের ভাই আলম খান। তিনি বলেন, তারা অস্ত্রোপচার কক্ষের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। চিকিৎসক বেড়িয়ে এসে জানালেন-রোগী জ্ঞান হারিয়েছেন। এরপর আর চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায়নি। ভুল অপারেশন করে তার ভাইকে হত্যা করেছেন চিকিৎসক জাহিদ। তিনিও জাহিদের বিচার দাবি করেন। নিহত ওসমান গণি লালপুর উপজেলার দুয়ারিয়া ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের লেদু মালিথার ছেলে। তিনি পেশায় কৃষক ছিলেন।
আনোয়ারা বেগমের পায়ে ড্রিল মেশিনের ফলা রেখেই সেলাই
জুন মাসের ৩ তারিখে পা পিচলে পড়ে তার স্ত্রীর বামপায়ের গোড়ালির কাছে হাড় ভেঙে যায়। তাৎক্ষণিক গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসক জাহিদকে দেখান। চিকিৎসক ব্যক্তিগত জাহেদা ক্লিনিকে নিয়ে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। ৬০ হাজার টাকায় সেখানে অস্ত্রপচার করা হয়। অস্ত্রপচার পরবর্তী এক্সরের ছবিতে ড্রিল মেশিনের ফলাটি স্পষ্টভাবে দেখা গেলেও চিকিৎসক সেটি এড়িয়ে যান। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলা সিধুলী গ্রামের লালচান মোহাম্মদের স্ত্রী।
ভুক্তভোগি নারীর স্বামী লাল চাঁন মোহাম্মদ আক্ষেপ করে কালবেলাকে বলেন, অস্ত্রপচারের তিন চার দিন পর থেকেই কাটা জায়গা থেকে পুঁজ বের হতে থাকে। অস্ত্রপচারের প্রায় ২৫ দিন পযর্ন্ত গুরুদাসপুর হাসপাতালে নিয়ে ড্রেসিং করানো হয়। কিন্তু কোনো উন্নতি ছিলনা। চিকিৎসক জাহিদও চিকিৎসা দিতে অনিহা করেন। এখন তার স্ত্রী পা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ইবনেসিনা হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক আয়ুব আলী কালবেলাকে বলেন, খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আনোয়ারা বেগমকে ঢাকায় আনা হয়। অস্ত্রপচারের জায়গার মাংসে পচন ধরেছিল। নতুন করে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর দেখা যায়- অস্ত্রপচারের সময় ড্রিল মেশিনের ফলা ভেঙে হাড়ের ভেতর রয়ে গেছে। হাড় জোড়া দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা পাতের নাটগুলোও এলোমেলোভাবে লাগানো ছিল। মাংসের পচন হাড় পৌঁছে গেছে। তিনি বলেন, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের এই ধরণের অপেশাদার চিকিৎসা ও অস্ত্রপচার ভুক্তভোগি আনোয়ারা বেগমের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হাড়-জোড়া রোগ বিশেষজ্ঞ (অর্থপেডিক্স) জাহিদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, তিনি কাউকে অপচিকিৎসা করেনি। অনেক সময় হাড় জোড়া লাগে না,সেটা পুনরায় করতে হয়।
নাটোরের সিভিল সার্জন চিকিৎসক মশিউর রহমান বলেন, চিকিৎসক জাহিদুলের চিকিৎসায় নিহত বা পঙ্গত্ববরণের খবর তিনি জানেন না।



