পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কল্যাণ কলস (খারিজ্জমা) গ্রামের সপ্তম শ্রেণির এক মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার মুখে। জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী মাত্র ১৪ বছর ৫ মাস ১৬ দিন বয়সী মোসাম্মৎ জান্নাতুলের অভিযোগ, তাকে ভয়ভীতি, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করে বাল্যবিবাহে বাধ্য করা হয়েছে। এখন তার একটাই দাবি—সে এই সংসার করতে চায় না; পড়াশোনা চালিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কলাগাছিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কল্যাণ কলস গ্রামের মৃত আব্দুল কাসেম হাওলাদারের ছোট মেয়ে মোসাম্মৎ জান্নাতুল একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তার জন্ম ১ জানুয়ারি ২০১২। কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা গেলে পরিবারে নেমে আসে দুর্যোগ। পরবর্তীতে তার মা বিদেশে চলে যান। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দাদি ফুল বানু নাতনির লালন-পালন ও পড়াশোনার দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশ থেকে দেশে ফিরে জান্নাতুলের মা রাহিমা খাতুন (৪০) পাশের বাড়ির নজরুল সিকদার (৫০)-কে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর জান্নাতুলকে তার মা, সৎ বাবা ও বড় বোনের সহযোগিতায় প্রাণনাশের হুমকি, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিয়েতে সম্মত হতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় তার সম্মতির একটি ভিডিওও ধারণ করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, প্রকৃত জন্ম নিবন্ধনে জান্নাতুলের বয়স ১৮ বছরের কম হলেও পটুয়াখালীতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে (তারিখ: ৭ জুন ২০২৬, নোটারি নং-১২৩৮/২৬) জন্মসংক্রান্ত তথ্য গোপন করে তার বয়স ১৮ বছর দেখানো হয়। এরপর একই দিনে পটুয়াখালী জেলার জৈনকাঠী ইউনিয়নের আলকাছ বিশ্বাসের ছেলে মোহাম্মদ কাউসার (২১)-এর সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনাটি জানাজানি হলে ৮ জুন ২০২৬ তারিখে জান্নাতুলের দাদি ফুল বানু বিষয়টি গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হকের নজরে আনেন। পরে ভারপ্রাপ্ত ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. রিয়াজ খান এবং কলাগাছিয়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে উদ্যোগ নিলেও সংশ্লিষ্টদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে জান্নাতুলের দাদি ফুল বানু বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর সংশ্লিষ্ট ৭, ৮, ৯ ও ১১ ধারায় গলাচিপার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তবে অভিযুক্তরা আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর জামিন লাভ করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর থেকে এবং অভিযুক্তরা জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর জান্নাতুল ও তার দাদিকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
জান্নাতুল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, “আমি কোথায় যাব? আমার বাবা নেই। আদালতে যদি আমি সুষ্ঠু বিচার না পাই, আমি আত্মহত্যা করব।”
কিশোরী জান্নাতুলের কণ্ঠে আজও একটাই স্বপ্ন—“আমি পড়াশোনা করতে চাই। আমি মানুষের মতো মানুষ হতে চাই। আমি স্বাবলম্বী হতে চাই। আমাকে যেন আমার শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।”
বাল্যবিবাহ শুধু একটি মেয়ের শৈশব কেড়ে নেয় না; এটি তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এদিকে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং একজন মেধাবী স্কুলছাত্রীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।




