মঙ্গলবার,২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হাওরাঞ্চলের শিক্ষার অগ্রদূত, মহান দানবীর ও সমাজসংস্কারক

বাংলার হাওরাঞ্চলের শিক্ষা-ইতিহাসে যে কজন মহৎ ব্যক্তির নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, তাঁদের মধ্যে শ্রী গুরুদয়াল সরকার অন্যতম।
তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ দানবীর, সফল মৎস্য ব্যবসায়ী, সমাজহিতৈষী এবং শিক্ষানুরাগী। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও শিক্ষার শক্তি ও গুরুত্ব তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
তাই ব্যক্তিগত সম্পদকে তিনি বিলাসিতার জন্য নয়, মানুষের কল্যাণ ও শিক্ষার প্রসারে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর অনন্য অবদান আজও কিশোরগঞ্জসহ সমগ্র হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয়।
শ্রী গুরুদয়াল সরকার ১৮৬২ সালের ২ অক্টোবর তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জের(বর্তমান  জেলা) ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের কাঠইর গ্রামে এক ধনাঢ্য কৈবর্ত (মৎস্যজীবী) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা গোপীমোহন সরকার এবং মাতা যশোধাময়ী দেবী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর অন্য দুই ভাই ছিলেন কৃষ্ণদয়াল সরকার ও বিষ্ণুদয়াল সরকার।
সে সময় এলাকাজুড়ে তাঁদের পরিবার ছিল সম্পদ, প্রভাব ও সামাজিক মর্যাদার জন্য সুপরিচিত। এই কারণেই স্থানীয় মানুষ স্নেহভরে তাঁকে ‘কৈবর্তরাজ’ নামে অভিহিত করতেন।
তাঁর শৈশবে হাওরাঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বিদ্যালয়ের অভাবে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাননি। গ্রামের একটি টোলে সামান্য অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেই তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু শিক্ষার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ কখনো থেমে থাকেনি।
আত্মপ্রচেষ্টায় তিনি রামায়ণ, মহাভারত ও পদ্মপুরাণ পাঠে দক্ষতা অর্জন করেন। সীমিত শিক্ষার মধ্যেও তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী ও আত্মশিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ।
পৈতৃক সূত্রে তিনি বিপুল ভূ-সম্পত্তির মালিক ছিলেন। পরবর্তীকালে হাওরের বিস্তীর্ণ বিল, বিশেষ করে বিখ্যাত ছান্দিনা বিল ইজারা নিয়ে মৎস্য ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। সততা, অধ্যবসায়, বিচক্ষণতা ও অসাধারণ ব্যবসায়িক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি অল্প সময়েই বিপুল সম্পদের অধিকারী হন এবং তৎকালীন কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ধনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তবে সম্পদের প্রাচুর্য তাঁর জীবনের একমাত্র পরিচয় ছিল না। নিজের শিক্ষাবঞ্চিত জীবনের বেদনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—শিক্ষাই পারে সমাজকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্তি দিতে। সেই উপলব্ধিই তাঁকে পরিণত করে এক অনন্য শিক্ষানুরাগীতে।
১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কিশোরগঞ্জ কলেজ মাত্র দুই বছরের মধ্যেই ভয়াবহ আর্থিক সংকটে অস্তিত্ব হারানোর উপক্রম হয়। ঠিক সেই সংকটময় সময়ে,
১৯৪৫ সালে, শ্রী গুরুদয়াল সরকার কোনো শর্ত ছাড়াই তৎকালীন সময়ের বিরাট অঙ্কের ৫০,০০০ টাকা কলেজের তহবিলে দান করেন। লোককথা ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ছান্দিনা বিলের প্রথম ‘খেও’-এর মাছ বিক্রির সমগ্র অর্থই তিনি কলেজের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
তাঁর এই দান শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করেনি; বরং সমগ্র হাওরাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিল।
এই মহৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাঁর স্নেহভাজন পুত্রবধূ মহামায়া রানী সরকার।
রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মহামায়া রানী শিক্ষার গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি শ্বশুরকে কষ্টার্জিত সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য উৎসাহিত করেন। তাঁদের এই যুগল মানবিক উদ্যোগ হাওরাঞ্চলের শিক্ষা-ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
শ্রী গুরুদয়াল সরকারের এই অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কিশোরগঞ্জ কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় গুরুদয়াল সরকারি কলেজ। আজও এই প্রতিষ্ঠান তাঁর মহান দানের অমর স্মৃতিচিহ্ন বহন করে চলেছে। এছাড়া তিনি তাঁর মায়ের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন যশোধাময়ী ফ্রি প্রাইমারি স্কুল, যা গ্রামীণ শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের ধনু নদীর তীরে অবস্থিত কাঠইর গ্রামে তাঁর ঐতিহাসিক পৈতৃক বাড়িটি আজও অতীতের গৌরবের সাক্ষ্য বহন করছে। হাওরের প্রচণ্ড ঢেউ, বৈরী প্রকৃতি ও সময়ের নির্মম আঘাত সত্ত্বেও বাড়িটির মূল কাঠামো এখনো অনেকটাই অক্ষত রয়েছে।
এর প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিক কারুকার্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বহু ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি যেখানে বিলুপ্তির পথে, সেখানে গুরুদয়াল সরকারের উত্তরসূরিরা এখনো এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে বসবাস করছেন এবং এর সংরক্ষণে আন্তরিক ভূমিকা পালন করছেন।
বর্ষাকালে যখন হাওরের বিস্তীর্ণ জনপদ জলমগ্ন হয়ে এক অপূর্ব রূপ ধারণ করে, তখন ধনু নদী পেরিয়ে অসংখ্য মানুষ, গবেষক ও পর্যটক কাঠইর গ্রামে আসেন। তাঁরা শুধু একটি ঐতিহাসিক বাড়ি দেখতে নয়, বরং এমন একজন মহান মানুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন, যিনি নিজের উপার্জিত সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ আলোকিত করেছিলেন।
১৯৫৫ সালের ২১ নভেম্বর ৯৩ বছর বয়সে এই মহান দানবীর পরলোকগমন করেন।
কিন্তু তাঁর জীবনদর্শন, উদারতা এবং শিক্ষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও হাওরাঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। শ্রী গুরুদয়াল সরকার কেবল একজন ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন না; তিনি ছিলেন আলোকিত সমাজ গঠনের এক দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর দান, মানবিকতা ও শিক্ষাপ্রেম বাংলার ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন